প্রকাশিত : ০৫ জুন, ২০২৬ ০৩:৫১ (শনিবার)
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক লুকানো রত্ন সুনামগঞ্জের লাকমাছড়া 

হাওড়-বাওড়ের জেলা সুনামগঞ্জে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতি বছর ভিড় জমান হাজারো পর্যটক। জেলার অন্যতম আকর্ষণ টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেক এবং বারেক টিলা-এর নাম অনেকেরই জানা। তবে এসব পরিচিত গন্তব্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি নয়নাভিরাম পর্যটনকেন্দ্র-লাকমাছড়া। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা লাকমাছড়া যেন এক শান্ত, নির্মল ও মনোমুগ্ধকর স্বর্গভূমি। এখানে দাঁড়ালে চোখে পড়ে ভারত সীমান্তঘেঁষা সবুজে মোড়ানো পাহাড়শ্রেণি, চুনাপাথরের বিশাল স্তূপ আর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের চাদর, দূরে ছড়ার ওপর ঝুলে থাকা বেইলি ব্রিজ এবং ছড়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চুনাপাথর মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য সৌন্দর্য। নির্জনতা, স্বচ্ছ জলধারা ও পাহাড়ি পরিবেশের মেলবন্ধনে লাকমাছড়া পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম। প্রকৃতির এত বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য একসঙ্গে খুব কম স্থানেই দেখা যায়। তাই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে লাকমাছড়া হতে পারে এক অনবদ্য গন্তব্য, যা একবার দেখলে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে।

মায়াবী রূপের লাকমাছড়া অবস্থিত ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া ও মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায়। মেঘালয় পাহাড়ের বুক চিরে অবিরাম গতিতে স্বচ্ছ পানির ধারা নেমে এসেছে ভারত-বাংলাদেশ জিরো পয়েন্টের দৃষ্টিনন্দন লাকমাছড়ায়। এ ছড়ার পানি আঁকা-বাঁকা হয়ে লাকমা গ্রাম ছুঁয়ে জেলার পাঠলাই নদী ও টাঙ্গুয়ার হাওরের মিঠা পানির সাথে মিলিত হয়েছে। বর্তমানে প্রকৃতির আশীর্বাদে অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত লাকমাছড়া দেখে যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমী মুগ্ধ হয়ে উঠবেন।

জানা গেছে, সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের কোলে উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের লাকমাছড়াটি আগে নালা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বর্ষায় দেশের অপার থেকে প্রবল বেগে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় নালাটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে যায়। ফলে ছড়া এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে। যদিও ছড়াটি হেমন্তে পানি কিছুটা কম থাকে, তবে বর্ষা মৌসুমে এই লাকমাছড়ার নান্দনিকতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্ষার সময় যেসব পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরতে আসনে তারা ছড়ার সৌন্দর্য দেখতে ভুলেন না আবার বেশিরভাগ পর্যটকদের অজানা এই লাকমাছড়ার কথা।
 
 স্থানীয় বাসিন্দা শুভ মিয়া বলেন, “সুনামগঞ্জে এখনো অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান রয়েছে, যেগুলো পর্যটকদের কাছে খুব বেশি পরিচিত নয়। আমাদের এলাকার লাকমাছড়া তেমনই একটি জায়গা। এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রতিদিন অনেক মানুষ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে আসেন, কিন্তু কাছেই থাকা এই মনোমুগ্ধকর স্থানটি অনেকেরই অজানা থেকে যায়। যারা একবার এখানে আসেন, তারা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। যথাযথ প্রচার ও পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে লাকমাছড়া দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।”

মিজানুর রহমান বলেন, “লাকমাছড়ার প্রকৃতি সত্যিই অপূর্ব। এখানকার পাহাড়, স্বচ্ছ পানির ছড়া, নির্মল পরিবেশ এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি যে কাউকে মুগ্ধ করবে। দূর-দূরান্ত থেকে সুনামগঞ্জে ঘুরতে আসা পর্যটকরা যদি একবার এই পাহাড়ি ঝরনার শীতল পানিতে নামেন, তাহলে মুহূর্তেই তাদের ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে লাকমাছড়ার সৌন্দর্য আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে পর্যটকদের জন্য মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা, পোশাক পরিবর্তনের সুবিধা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে দেশ-বিদেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি আরও জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে।”

 
কিভাবে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য লাকমাছড়ায়

ঢাকার গাবতলী, মহাখালী, সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল ও ফকিরাপুল থেকে সরাসরি সুনামগঞ্জের বাস পাওয়া যায়। বর্তমানে ঢাকা থেকে শ্যামলী, হানিফ, মামুন, এনাসহ বেশকিছু বাস যায় ঢাকা-সুনামগঞ্জ চলাচল করে, এসব বাসে জনপ্রতি ৮০০ টাকা থেকে ৮৫০ টাকা ভাড়া।  

সুনামগঞ্জ পুরাতন বাস স্টেশন অথবা আব্দুল জহুর সেতুতে ( সুরমা ব্রিজ) নেমে, সিএনজি, লেগুনা সহ মোটরসাইকেল ভাড়া করে আপনি যেতে পারবেন লাকমাছড়ায়৷ আব্দুল জহুর সেতু ( সুরমা ব্রিজ) থেকে পলাশ বাজার হয়ে ধনপুর সড়কে এই সহজে যাওয়া যায়। তবে পথে যাদুকাটা নদী পারাপার হতে হবে। আব্দুল জহুর ব্রিজ থেকে সরাসরি লাকমাছড়ার মোটরবাইকের জনপ্রতি ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তবে সিএনজি অটোরিশকাও পাওয়া যায়। কিন্তু আপনি যেকোনো বাহনে উঠার আগেই দরদাম করে নেওয়া উত্তম। 

থাকার ব্যবস্থা

লাকমাছড়া এলাকায় সীমিত পর্যটন সুবিধা থাকায় অধিকাংশ ভ্রমণকারী সুনামগঞ্জ শহরে অবস্থান করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল, গেস্ট হাউজ এবং সরকারি আবাসন সুবিধা রয়েছে। ফলে আরামদায়ক রাত্রীযাপনের জন্য জেলা শহরই তুলনামূলক ভালো বিকল্প।

খাবারের ব্যবস্থা

লাকমাছড়ার আশেপাশে বড়ছড়া বাজারে কয়েকটি স্থানীয় খাবারের দোকান পাওয়া যায়, যেখানে সাধারণ খাবার ও নাশতার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বড় রেস্টুরেন্টের সুযোগ সীমিত। তাই চাইলে সুনামগঞ্জ শহর থেকেই খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন, বিশেষ করে দলবদ্ধ ভ্রমণ বা দীর্ঘ সময় অবস্থানের পরিকল্পনা থাকলে।