প্রকাশিত : ০৬ জুন, ২০২৬ ২৩:১৯ (শনিবার)
অবৈধ ড্রেজারের ফুল ফুটে কোটিপতি ফুল মিয়া

ছবিঃ ওয়ান টিভি

সুনামগঞ্জ পৌর শহরে দুই লেনের ৪ কিলোমিটার সড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান। এই উন্নয়ন প্রকল্পে সড়ক প্রসস্থ করার জন্য সুরমা নদীর সদর উপজেলার ব্রাক্ষণগাঁও ও জলিলপুর থেকে ৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি পায় জে.ও.এন-জেভির পক্ষে রাজ এন্টারপ্রাইজের মো মোসাদ্দেক হোসেন বাচ্চু।  অভিযোগ রয়েছে, ‘আলভি আরাফ ফারাজি’ নামের ড্রেজার ব্যবহার করে এই বালু উত্তোলন কার্যক্রমের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক গৌরারং ইউপি চেয়ারম্যান ফুল মিয়া। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪০ দিনের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও জাতীয় নির্বাচন, মেশিনে ত্রুটি, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণ দেখিয়ে জেলা প্রশাসনের অনুমোদনে দু’দফায় আরও ৩৩ দিন সময় বৃদ্ধি করা হয়। বর্ধিত সময়সীমার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৬ মে।

শর্তসাপেক্ষে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অবানিজ্যিক ভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি নিয়ে কোনো শর্তের তোয়াক্কা না করেই দেদারসে অবৈধভাবে চালাচ্ছেন সরকারি প্রকল্পের বালু বিক্রির রমরমা বানিজ্য। শহরের উন্নয়ন প্রকল্পের বালু ডাম্প করছেন শহরের বাইরে নিজ ইউনিয়নে। সেখান থেকে ট্রাকে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। তবে এক্ষেত্রে এক অবিশ্বাস্য যুক্তিও দেখিয়েছেন ফুল মিয়া। শহরে জলাবদ্ধতার কারণে শহর থেকে দূরে সুরমা নদীর অপর প্রান্ত গৌরারং ইউনিয়নে বালু স্তুপ করে রেখেছেন তিনি। 

এদিকে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর পর ড্রেজার ব্যবসায় ভাগ্য খুলেছে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ফুল মিয়ার। ড্রেজার মেশিনের বদৌলতে আলাদীনের চেরাগ ঘষে রাতারাতি অবস্থার পরিবর্তন করেছেন বিএনপির এই নেতা। বছর দেড় সময়ের মধ্যে বনে গেছেন ড্রেজার সিন্ডেকেটের মহারাজ। তাঁর অদৃশ্য শক্তিতে নিয়ন্ত্রণে এসেছে বালির ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, জেলার শহরের মালিকানা ভূমি ভরাট ও জেলার বাহিরে বালির ব্যবসা মাধ্যমে কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন ফুল মিয়া।

সরেজমিনে ৩দিন প্রকল্প এলাকা থেকে ৩ কিলোমিটার দূর গৌরারং ইউনিয়নের অচিন্তপুর ইটভাটার পাশে গিয়ে দেখা যায় দিন দুপুরে সরকারি বালু লুটের মচ্ছব। ইটভাটার ঘাটে ড্রেজার দিয়ে আনলোড হচ্ছে বালু। অচিন্তপুরে একটি নৌকা আনলোডের সময় তার ঠিক বিপরীতে শহরের বড়পাড়া ঘাটে আনলোডের অপেক্ষায় এমবি ইভা নামের আরেকটি ৯ হাজার বর্গফুটের নৌকা। 

এই নৌকার সুকানি বলেন, উজানে আমবাড়ির আগে থেকে বালু উত্তোলন করে নিয়ে আসছি। ফুল মিয়া চেয়ারম্যান আমাদের এখানে আনছে। বলছে এইটা ফোর লেনের বৈধ বালু। আমি কামলা মানুষ কাজে আসছি, তারা যেখানে বলে সেখানে বালু আনলোড করি। ফুল মিয়া চেয়ারম্যানের কথায় আমরা এখানেই (অচিন্তপুর) বালু ফেলি। এসময় অননুমোদিত জায়গায় বালু আনলোডের বৈধতা জানতে চাইলে সুকানি ফোন দেন ফুল মিয়াকে। ফোনে সুকানিকে ফুল মিয়া জানান, সবকিছুর বৈধতা আছে। ফোরলেনের বালু উত্তোলন করে সেখানে ফেলা হচ্ছে। একই কথা জানান এমভি শাহদাত নৌকার সুকানি।

নদী থেকে বালু উত্তোলনের পর ড্রেজারের মাধ্যমে আনলোড করা পাইপের সূত্র ধরে বালু ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে চোখ কপালে উঠে যায়। বিশাল বড় এলাকা নিয়ে অচিন্তপুর ইটাভাটার পাশের মাঠে স্তুপ করা হয়েছ বালু। এই স্তুপকৃত বালু উত্তোলন করে ট্রাকে ভর্তি করার কাজ করছে দুটি এক্সেভেটর। একের পর এক ট্রাক লোড হচ্ছে আবার খালি হয়ে ফিরে আসছে। এসব ট্রাকের পিছু নিয়ে দেখা যায়, ইটভাটা থেকে লালপুর স্বাধীন বাজারের কাঁচা রাস্তা হয়ে দক্ষিন দিকে শহরে না গিয়ে ট্রাকগুলো চলে যাচ্ছে বিশ্বম্ভরপুরের রাস্তায়।  

ট্রাক ড্রাইভার মজিদকে জিজ্ঞেস করে জানা যায়,  শহরে বালু নেয়ার কোন নির্দেশনা নাই তাদের। বিশ্বম্ভরপুরের চালবনের রাস্তা দিয়ে বালু নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রত্যেকদিন তিনি এভাবেই সকাল থেকে সন্ধ্যা এই বালু পরিবহন করে শহরের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। 

দায়িত্বশীল সরকারি সংস্থার হিসেব বলছে, ৫ লাখ ঘনফুটের অনুমতি নিয়ে এখন পর্যন্ত বালু উত্তোলন হয়েছে ১৭ লক্ষাধিক ঘনফুট বালু।  অবৈধভাবে শুধু একটি জায়গায় বিক্রি হয়েছে ১২ লাখ ঘনফুটের অধিক বালু। টাকার পরিমানে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি টাকারও বেশি। 

তবে এতো প্রমাণ থাকা স্বত্বেও বালু বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফুল মিয়া। দাড় করিয়েছেন মনগড়া যুক্তি। তিনি বলেন, ফোর লেনের বালু বাইরে বিক্রি করার সুযোগ নেই। ফোর লেনের বালু ফোর লেনেই যাচ্ছে। শহরের ভিতরে বালু রাখলে জলাবদ্ধতা হয় তাই শহরের বাইরে রাখছেন। 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভিট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর বাইরে যদি বালু যায় সেটা অবৈধ। এমন তথ্য এই প্রথম প্রতিবেদকের কাছ থেকে জানলেন। তদন্ত করে এমনটি পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ওয়ান টিভি/ মনোয়ার