প্রকাশিত : ১৬ জুন, ২০২৬ ১৬:৩০ (শনিবার)
মহানবী (সা.) ও সাহাবিদের ৭টি জনপ্রিয় খেলা

ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং এটি মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। তাই মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক সুস্থতার জন্য ইসলাম বিনোদন ও খেলাধুলাকে পুরোপুরি অনুমোদন দেয়। বিশেষ করে যে সমস্ত খেলাধুলা শরীর গঠন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে, সেগুলোতে স্বয়ং বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উৎসাহিত করতেন। উপযুক্ত নিয়তে শরীর সতেজ রাখার উদ্দেশ্যে খেলাধুলা করা ইসলামে জায়েজ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি প্রশংসনীয়ও বটে।

তবে বিনোদনের নামে যেখানে সময়ের চরম অপচয় ঘটে, জুয়া কিংবা বাজির মতো নিষিদ্ধ ও গুনাহের বিষয় জড়িয়ে থাকে, ইসলামে সে ধরনের খেলাধুলা সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নাজায়েজ। একইভাবে খেলার মাঠে সতর ঢাকা থাকা বাধ্যতামূলক এবং যেকোনো ধরনের অশ্লীলতা বা কামোদ্দীপক পরিবেশ সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। হাদিস শরিফে কবুতর ওড়ানো কিংবা পাশা খেলার মতো কিছু নির্দিষ্ট খেলাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া যে খেলায় জীবনের ঝুঁকি থাকে, তা-ও ইসলাম সমর্থন করে না। সবচেয়ে বড় কথা, খেলাধুলার মোহে পড়ে মানুষ যেন মহান আল্লাহর স্মরণ এবং নামাজ থেকে গাফেল বা উদাসীন না হয়ে পড়ে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।

এই সমস্ত শরয়ি নীতিমালা মেনে নবীযুগে সাহাবায়ে কেরাম নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও শারীরিক কসরত করতেন। ইসলামের সোনালী ইতিহাসের পাতা ওল্টালে সাহাবিদের প্রিয় বেশ কিছু স্বাস্থ্যসম্মত খেলার বিবরণ পাওয়া যায়। নিচে তেমন কয়েকটি খেলা তুলে ধরা হলো:

১. তীর নিক্ষেপ (তীরন্দাজি)

নবী কারিম (সা.)-এর যুগে তীরন্দাজি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় একটি খেলা। এটি একদিকে যেমন ছিল যুদ্ধের মোক্ষম প্রস্তুতি, অন্যদিকে চমৎকার শারীরিক ব্যায়াম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই খেলার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি এর ফজিলত বর্ণনা করে বলেছেন, একটি তীরের উসিলায় আল্লাহ তাআলা তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেনএর প্রস্তুতকারক (যে নেক নিয়তে তা বানিয়েছে), তীর নিক্ষেপকারী এবং যে তীর এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করে। তিনি আরও তাগিদ দিয়ে বলেন, তোমরা তীর চালানো ও ঘোড়সওয়ারি শেখো; তবে ঘোড়দৌড়ের চেয়ে তীরন্দাজি শেখা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)

২. সাঁতার কাটা

সাহাবিদের সাঁতার শেখার ব্যাপারেও আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বিশেষ নির্দেশনা ছিল। এক হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর স্মরণহীন যেকোনো বিষয়ই অর্থহীন ও ব্যর্থ, কেবল চারটি কাজ ছাড়া। সেগুলো হলোতীর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে নিশানা ঠিক করা, নিজের ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্ত্রীর সাথে আনন্দ-কৌতুক করা এবং সাঁতার শেখা। (সুনানে কুবরা লিল-নাসায়ি: ৮৯৪০)

৩. ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা

আরবদের রক্তে মিশে ছিল ঘোড়দৌড়ের ঐতিহ্য। মহানবী (সা.) নিজে সাহাবিদের নিয়ে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়াগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা হাফয়া থেকে শুরু হয়ে সানিয়্যাতুল বিদা নামক স্থানে গিয়ে শেষ হতো (যার দূরত্ব ছিল প্রায় ছয় বা সাত মাইল)। অন্যদিকে সাধারণ বা অপ্রশিক্ষিত ঘোড়ার দৌড় শুরু হতো সানিয়্যাতুল বিদা থেকে এবং শেষ হতো বনু জুরাইক-এর মসজিদে (যার দূরত্ব ছিল প্রায় এক মাইল)। ইবনে ওমর (রা.) নিজেও এই প্রতিযোগিতায় সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৭০)

৪. মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি

আরব সমাজে শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম ছিল মল্লযুদ্ধ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটি বেশ প্রচলিত ছিল। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও একবার কুস্তিতে অংশ নিয়েছিলেন। মক্কার বিখ্যাত ও অপরাজেয় কুস্তিগির রুকানা বিন ইয়াজিদকে নবীজি যখন ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন সে তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, আমি যদি কুস্তিতে তোমাকে হারিয়ে দিতে পারি, তবে কি তুমি ঈমান আনবে? রুকানা রাজি হলে মহানবী (সা.) তাকে মল্লযুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ১/৩৯০)

৫. দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতা

ইসলামের প্রসারে দাওয়াতি কাজ, জিহাদের ময়দান কিংবা হালাল রুজি উপার্জনের উদ্দেশ্যে সাহাবিরা যখন বিভিন্ন স্থানে যেতেন, তখন প্রায়ই নিজেদের মধ্যে দ্রুত হাঁটার প্রতিযোগিতা করতেন। সৎ কাজের উদ্দেশ্যে এই ধরনের প্রতিযোগিতাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতিবাচক হিসেবে দেখতেন।

৬. বাহন বা পশুর প্রশিক্ষণ

যাতায়াত ও যুদ্ধের বাহন হিসেবে ব্যবহৃত পশুদের (যেমন ঘোড়া বা উট) দক্ষ করে তোলার জন্য সাহাবিরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতেন। এটিও এক ধরনের ক্রীড়াশৈলী ও কসরত ছিল, যা হাদিস দ্বারা সমর্থিত।

৭. ভারোত্তোলন (পাথর তোলা)

তৎকালীন সমাজে কে কত বেশি ভারী জিনিস তুলতে পারেএমন প্রতিযোগিতারও প্রচলন ছিল। বলা হয়ে থাকে, বিখ্যাত সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর হাত ধরেই প্রথম এই ধারণার সৃষ্টি হয়। একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর একটি জনপদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একদল মানুষকে ভারী পাথর তুলতে দেখেন। তিনি জানতে চাইলেন তারা কী করছে? উত্তর এলো, তারা নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করতে পাথর তুলছে। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) মন্তব্য করেন, আল্লাহর পথের একনিষ্ঠ কর্মীরাই প্রকৃত অর্থে এদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। (ইরশাদুল গালিল: ৫/৩৩৩)

ইসলামের সোনালী যুগে সাহাবিদের মাঝে চমৎকার ও স্বাস্থ্যসম্মত বিনোদনের চর্চা ছিল। ইসলাম কখনোই জীবনকে আনন্দহীন বা একঘেয়ে করার শিক্ষা দেয় না, বরং বিনোদনের একটি মার্জিত ও কল্যাণকর সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমান যুগে যখন খেলাধুলার আড়ালে জুয়া, বাজি আর বেহায়াপনার ছড়াছড়ি, তখন নবীযুগের এই ইতিহাস আমাদের সঠিক পথ দেখায়। বর্তমান সময়েও আমরা ফুটবল, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টনের মতো আধুনিক খেলাগুলো খেলতে পারিযদি তা আমাদের ফরজ ইবাদত ও নামাজ থেকে দূরে না রাখে এবং শরীয়তের কোনো বিধান লঙ্ঘন না করে।