প্রকাশিত : ০৭ জুলাই, ২০২৬ ২১:৫০ (শনিবার)
বিদ্যুতের ট্রাজিডিতে শোকে মুহ্যমান অনন্তপুর গ্রাম

কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা। ছবি: তানভীর আহমেদ

গ্রামের কবরস্থানে একই সাথে খুঁড়া হয় মা- বাবা ও সন্তানের কবর। এক পরিবারের তিন জনের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত এক সাথে। মঙ্গলবার দুপুরে এমন হৃদয়বিধায়ক ঘটনার স্বাক্ষী হন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের হাজারো মানুষ। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যে শোকে স্তব্ধ পুরো গ্রাম। স্বজনদের আহাজারি আর পিতাহারা অবুঝ শিশুদের নিষ্পাপ চাহনী ভারি হয়ে উঠে চারপাশ। বিদ্যুতের ভয়াবহতার ট্রাজিডিতে চোখের জল আসে আপন পর সকলের।

জানা যায়, গত সোমবার বিকালে দোকানঘর মেরামত করছিলেন অনন্তপুর গ্রামের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ নুরুল আমীন ও তার ছেলে ফরহাদ শাহ (৩৫)। এসময় দোকান ঘরের পাশে থাকা বিদ্যুৎ মিটার সরাতে গিয়ে অসতর্কতাবশত বৈদ্যুতিক লাইনে জড়িয়ে পড়েন পিতাপুত্র। চিৎকার শুনে স্বামী সন্তানকে বাঁচাতে এগিয়ে যান বৃদ্ধা ফাতেমা বেগম।  এসময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনজনই গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। মর্মান্তিক এমন দুর্ঘটনার বাকরুদ্ধ এলাকাবাসী। একসাথে তিন স্বজনকে হারিয়ে আহাজারি থামছেন পরিবারের বাকি স্বজনদের।

দুর্ঘটনায় নিহত ছেলে ফরহাদ ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের বয়স ৫ বছর, দ্বিতীয় সন্তান দেড় বছর ও ছোট সন্তানের বয়স মাত্র তিন মাস। রেখে যাওয়া তিন অবুঝ শিশু'র ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চিয়তায় স্বজনরা। স্বামীর কথা স্মরণে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন ফরহাদের স্ত্রী। এমন হৃদয় বিধায়ক দৃশ্য দেখের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি প্রতিবেশী কেউই।

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের অসেচতনা ও পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীলদের উদীসনতায় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বলে দাবি তাদের। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মৃত্যু ঝুঁকি এরাতে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও  সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষে বিহীত ব্যবস্থা তাগিদ সচেতন মহলের।

গ্রামের বাসিন্দা ও নিহতদের স্বজন শফিকুল ইসলাম বলেন,এমন মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা বাকরুদ্ধ। একটি পরিবারের এমন পরিনতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিনা। পরিবারটি একে বারে নিঃশ্ব হয়েগেছে। অবুঝ বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কি হবে জানিনা। বিদ্যুৎ বিভাগের অনেক অবহেলা রয়েছে। প্রায়সই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ। ঝুঁকিপুর্ণ লাইনের কারনে অসচেতন মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। এর ক্ষতিপূরণ কে দিবে।

ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বলেন, বিদ্যুৎ পিষ্ট হয়ে এক পরিবারের তিন জনের মৃত্যু এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমার এলাকাটি অনেক দূর্গম। এখানের মানুষ ততোটা সচেতন নয়। এখানে ঘরবাড়িগুলো টিনের। প্রায় স্থানে বিদ্যুৎ লাইন ঝুঁকিপুর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এই জনপ্রতিনিধি।

দুর্ঘটনার জন্যে নিজেদের দায় এরিয়ে নিহতদের অসকর্তাকে দায়ি করেন পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের বিশ্বম্ভরপুর সাব জোনের এজিএম সুলতান মাহমুদ। তিনি বলেন, মানুষ কিছু হলেই দোষ দিতে পারে। তবে এই ঘটনাটি নিহতদের কারনে হয়েছে। তারা অফিসকে না জানিয়ে স্থানান্তর করেন। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একারনে বিদ্যুতায়িত হয়ে তারা মারাগেছেন। বিদ্যুৎ বিভাগকে অবহিত না করে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে দুর্ঘটনায় সমবেদনা জানিয়ে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অন্তত মর্মান্তিক। আমরা চেষ্টা করবে পরিবারের পাশে থাকার। সমাজের বিত্তবানদের পরিবারকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে আহ্বান এই কর্মকর্তার।

সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট নুরুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। বর্তমানে সংসদ চলায় ঢাকায় আছি৷ এলাকায় ফিরে এসে নিহতের স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।