ছবি : সংগৃহীত
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব সারা দেশে চলছিলো কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন।সারাদেশের মতো সুনামগঞ্জেও উত্তাল ছিল মিছিলে স্লোগানে।আন্দোলনকারীদের নানাভাবে দমন-পীড়নের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আ.লীগ সরকার।সারাদেশেই আন্দোলন নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র নেতাদের গ্রেফতার করতে শুরু করে পুলিশ।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রাতে জেলা শহর থেকে গ্রেফতার হন তৎকালীন সুনামগঞ্জ জেলা শিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক ও বর্তমান জেলা সভাপতি ফারহান শাহারিয়ার ফাহিম। গ্রেফতারের পর ডিবি পুলিশের দ্বারা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন তিনি। শুক্রবার(১৭জুলাই) রাতে সুনামগঞ্জ জেলা সভাপতি তার নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।সেখানে তিনি ডিবি পুলিশের নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন। পাঠকদের সুবিধার্থে ফেসবুকে তার লেখাটা হুবহু তুলে ধরছি।
তিনি লিখেন ১৬ জুলাই রাত পুলিশি টর্চার।কি এতো শত্রুতা,কেনো?রাত ১.টার পরে দরজা তালা ভেঙে ঢুকে পড়ার পর মুহূর্তের মাঝেই ছোট্ট ঘরটা এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে পরিণত হলো। হাতে হাতকড়া পরিয়ে, চোখ শক্ত কাপড়ে বেঁধে আমাকে তুলে নেওয়া হলো গাড়িতে। এরপর যখন গাড়ি থামল এবং আমাকে নামানো হলো, তাদের কথাবার্তা আর পরিবেশ থেকে বুঝতে পেরে মনে হলো, আমাকে সম্ভবত ডিবি অফিসে নিয়ে আসা হয়েছে।
আর এই ডিবি অফিসের চার দেয়ালের ভেতরেই শুরু হলো সেই পরিচিত চিত্রনাট্যের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়।চোখ বাঁধা, দুহাত পেছনে কঠিন হাতকড়ায় আটকানো অবস্থায় আমাকে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হলো। এরপর শুরু হলো সেই অমানবিক পদ্ধতি পায়ের পাতায় নির্মম আঘাত। মোটা লাঠি দিয়ে তারা সজোরে আমার পায়ের তালুতে পেটাতে শুরু করল।পায়ের পাতায় পড়া প্রতিটি আঘাতে মনে হচ্ছিল যেন তীব্র যন্ত্রণার এক বৈদ্যুতিক শক পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। পায়ের তালুর চামড়া ফেটে যাওয়ার মতো সেই অসহনীয় ব্যথায় পা দুটো অবশ হয়ে আসতে চাইছিল। ঠিকমতো দাঁড়ানোর বা হাঁটার শক্তিটুকুও যেন তারা কেড়ে নিতে চাইছিল। পায়ের পাতায় নারকীয় আঘাতের পাশাপাশি টের পাচ্ছিলাম পর মুহূর্তেই লাঠির বাড়ি আছড়ে পড়ছে উরুতে।
শারীরিক এই নির্যাতনের সাথে পাল্লা দিয়ে ডিবি অফিসের সেই প্রকোষ্ঠে চলছিল অশ্রাব্য গালিগালাজ, কান ফাটানো ধমক আর একের পর এক হুমকি। কিরে, খুব তো স্লোগান দিচ্ছিলি! সুনামগঞ্জ মিছিল কখন দিচ্ছিস? টাকা কে দেয় তোদের? এমন সব তীক্ষ্ণ কথা আর উপহাসের মাধ্যমে তারা আমার মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে চাইছিল। তারা চাইছিল আমি যেন ব্যথায় আর্তনাদ করি, ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে তাদের অপবাদ গুলো মেনে নেই অস্ত্রের তথ্য দিয়ে দায় নেই !
পায়ের পাতার অসহ্য যন্ত্রণা আর সারা শরীরের প্রতিটি আঘাত আমাকে একটু একটু করে অবশ করে দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ভেতরের মানুষটা তখন অদ্ভুত শান্ত। তারা ভেবেছিল, তুলে এনে পায়ের পাতায় পিটিয়ে শরীর ভেঙে দিলে বোধহয় বিপ্লবের আগুন নিভে যাবে,মনের দৃঢ়তাও চুরমার হয়ে যাবে।
কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, সেই রাতের এই পৈশাচিক 'উত্তম-মধ্যম' আমার কাছে কোনো পরাজয় ছিল না;বরং তা ছিল অধিকার আদায়ের পথে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার এক জ্বলন্ত স্মারক।ব্যথায় নীল হওয়া উরু আর অবশ হয়ে আসা পা নিয়েই আমি মনে মনে সেদিন আরও একবার উচ্চারণ করছিলাম "তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার!"