ছবি : ওয়ানটিভি
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে উদ্দেশ্য করে সুনামগঞ্জের তরুণ লেখক জাদীদ আহমেদ পাওয়েল।তার ভ্যারিফাইড ফেসবুকে লিখা চিঠি আমরা পাঠকদের জন্য হুবুহু তুলে ধরলাম।
প্রিয় মন্ত্রী ববি হাজ্জাজ,
আপনি এই মুহূর্তে যে জেলা ভিজিট করছেন, সেই সুনামগঞ্জ আমার জন্মস্থান।আমার বাড়ি।খুবই সুন্দর একটা এলাকা। যার সৌন্দর্যের পেছনের যে একটা ভয়াবহ ডার্কনেস লুকানো আছে সেটা খুব কম মানুষই জানে কিংবা জানতে চায়!
আমি জানি, একটা অফিসিয়াল ভিজিটে আপনাকে সুনামগঞ্জের এডুকেশনের সবচেয়ে পলিশড ভার্সনটাই দেখানো হবে। এটাই বাংলাদেশের রিচুয়াল।আপনাকে কিছু সিলেক্টেড স্কুলে নেয়া হবে কিংবা যাবেন, প্রিপেয়ার্ড অফিসিয়ালদের সঙ্গে দেখা করবেন, পরিষ্কার ক্লাসরুম দেখবেন, সাজানো প্রোগ্রাম এবং সিলেক্ট করা কিছু স্টুডেন্টকে সামনে আনা হবে। সবকিছুই বেশ সুন্দর এবং গোছানোই লাগবে আপনার কাছে।
কিন্তু আমাদের যাদের বাড়ি, সেখানে বড় হয়েছি এবং প্রতিদিন আমাদের পরিবারের সন্তানদের ওই স্কুলগুলোতে পাঠাই, আমরা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা সুনামগঞ্জকে চিনি, যেটা সম্ভবত আপনি দেখতে পাবেন না।আমি বরং সুনামগঞ্জের ডার্কনেস আপনাকে দেখানোর চেষ্টা করি....
সুনামগঞ্জের জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে ৬ লাখ ১৪ হাজারের বেশির বয়স দশ বছরের নিচে। মানে পুরো জেলার পপুলেশনের প্রায় ২৫% ছোট শিশু।আমাদের লিটারেসি রেট মাত্র ৬৪.৯২%, যেখানে ন্যাশনাল রেট ৭৪.৮০%। আর কাগজে যে ৬৪% দেখানো হয়, বাস্তবে সেটা আরও অনেক কম বলেই আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশ তো!
জেলার ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ রুরাল এরিয়ায় বাস করেন। মানে ঠিকঠাক, রাস্তা, যাতায়াত ইত্যাদি নেই। ফলে বেশিরভাগ বাচ্চাদের স্কুলে যেতে গেলে নৌকায়, নদী পার হয়ে, পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তা দিয়ে হেটে কিংবা গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তা কিংবা খুব ইন্টারেস্টিংলি ধানক্ষেতের আইল দিয়ে হেটে স্কুলে যেতে হয়।বিশ্বাস নাও হইতে পারে আপনার! But I like to call a spade a spade!
অফিসিয়ালি, সুনামগঞ্জে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২,১০০টির বেশি প্রাইমারি ইনস্টিটিউশন, প্রায় ১০,০০০ শিক্ষক এবং প্রি-প্রাইমারি থেকে গ্রেড ফাইভ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ৮৯২ জন স্টুডেন্ট আছে।সরকারি প্রাইমারী স্কুল আছে খুব সম্ভবত ১৪৭৫ টি এবং এগুলোর বেশিরভাগেই যথেষ্ট শিক্ষক নেই। প্রায় ১০০০+ শিক্ষক সংকট আছে এই স্কুলগুলোতে।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ টা গ্রেডে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী আছে, কিন্ত শিক্ষক হচ্ছেন ১ জন! গত তিনবছর ধরে একজন টিচার এই স্কুলটা একাই চালাচ্ছেন!এরকম আরও প্রচুর প্রচুর প্রচুর স্কুল আপনাকে আমিই দেখাতে পারবো। নিয়ে যেতে পারবো। যেখানে আমাদের এবং আপনার মিনিস্ট্রির সিস্টেম কম্পিটলি কোলাপস করেছে।এই কোলাপসের ফলাফল সুনামগঞ্জের প্রাইমারি ড্রপআউট রেট ২১.২৪%, যেখানে ন্যাশনাল রেট ১৩.১৫%! ছেলেদের মধ্যে এই ড্রপআউট রেট আরও বেশি, ২৩.২৬%।
প্রাইমারি সারভাইভাল রেট ৭৮.৭৮% অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন শিশুর প্রাইমারি স্কুল থেকেই ঝড়ে যায়!আর আপনাকে যে ডেটা দেখানো হবে, তার বড় একটা অংশ অন্তত একচুয়াল রিয়েলিটির সঙ্গে মিলবে না। কারণ এইটাই বাংলাদেশ!
সেকেন্ডারি স্কুল লেভেলে সুনামগঞ্জে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৫ জন স্টুডেন্টের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ২,৬৪৯ জন। অর্থাৎ প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে প্রায় ৫২ জন স্টুডেন্ট। ন্যাশনালি এই নাম্বার প্রায় ৩৪ জন।মানে সুনামগঞ্জের সেকেন্ডারি লেভেলের শিক্ষকরা ন্যাশনাল এভারেজের তুলনায় প্রায় ৫৫% বেশি স্টুডেন্ট সামলাচ্ছেন! দ্বিগুণেরও বেশি!
জেলার ২৭৭টি সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনের মধ্যে ২৩৮টিই প্রাইভেট। পাবলিক ইনস্টিটিউশন হিসেবে তালিকাভুক্ত আছে মাত্র ১৪টি! এত বড়, দরিদ্র এবং জিওগ্রাফিক্যালি ডিফিকাল্ট একটা জেলার জন্য মাত্র ১৪ টা সরকারী হাইস্কুল! যে জেলায় ১০ বছর বয়সের নিচে পপুলেশন ৬ লাখের মতন সেখানে মাত্র ১৪ টা সরকারী হাইস্কুল!সুনামগঞ্জের সেকেন্ডারি স্টুডেন্টদের প্রায় ৫৬% মেয়ে অথচ সেকেন্ডারি শিক্ষকদের মধ্যে নারী মাত্র ২১% মতো!
সুনামগঞ্জে প্রচুর মেয়ে দারিদ্র্য, দূরত্ব, অনিরাপত্তা এবং সোশ্যাল প্রেশারের মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু সিস্টেম তাদের যথেষ্ট নারী শিক্ষক, মেন্টর দিতে পারছে না।
কলেজ লেভেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সুনামগঞ্জে ৫৫ হাজার ২৯৭ জন কলেজ স্টুডেন্টের জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র ৭৬৬ জন। অর্থাৎ প্রতি কলেজ শিক্ষকের বিপরীতে প্রায় ৭২ জন স্টুডেন্ট। যেখানে ন্যাশনাল রেশিও প্রায় ৩৮! সুনামগঞ্জের একেকটা কলেজে গড়ে শিক্ষক আছেন মাত্র ১৩ জন, যেখানে ন্যাশনাল এভারেজ প্রায় ২৮ জন। পুরো জেলায় মাস্টার্স লেভেলের কলেজ মাত্র একটি, অনার্স কলেজ সাতটি এবং ডিগ্রি পাস কলেজ এগারোটি।
এর মানে হচ্ছে, অনেক ট্যালেন্টেড স্টুডেন্টকে শুধু হায়ার এডুকেশনের জন্য নিজের পরিবার এবং জেলা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়। বাড়ি ছাড়তে হয়, ঘর ছাড়তে হয়। কতজনের পক্ষে এই কষ্ট এফোর্ড করা পসিবল?
২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সুনামগঞ্জের পাস রেট ছিল মাত্র ৪৫.৮০%। ন্যাশনাল পাস রেট ছিল ৫৮.৮৩%।
আপনি তো পুরো ব্যাসিক ডেটা দেখলেন এবং এর রেজাল্ট তো চোখের সামনেই এবং কেন এমন হচ্ছে সেটাও তো অজানা না। আপনি চাইলে আরও ভালো ডেটা কালেক্ট করা পসিবল।
এত অফিসিয়াল ডেটা দেখার পরও আমার বিশ্বাস হয় না যে আসলেই ড্যামেজ এতটুকুই কিনা। কারণ খোলা চোখে আমার কাছে মনে হয় আমাদের ড্যামেজ আরও বেশি খারাপ। ব্যাসিকেলি বছরের পর বছর ধরে নেগলেক্টেড একটা এডুকেশন কালচারের রেজাল্ট এবং এইটা দিনকে দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
প্লিজ, সুনামগঞ্জের সৌন্দর্য দেখে ভুল বুঝবেন না।
We are suffering, and our next generation is beginning to collapse mentally. Once, we were one of the most culturally progressive regions in the country. Today, we are moving in the exact opposite direction.
Thanks in advance!
লেখক-:জাদীদ আহমেদ পাওয়েল
তরুণ লেখক ও গবেষক