প্রকাশিত : ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১৭:০৯ (বুধবার)
ভূমধ্যসাগর থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া ২৯ জনের ১৮ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জ

ছবি: সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা

স্বপ্ন ছিল ইউরোপের মাটিতে পা রাখার। সেই স্বপ্ন নিয়েই লিবিয়া থেকে ভয়ংকর সমুদ্রপথে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন ৪২ জন। উত্তাল  ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর খাবার ও পানি সংকটে ইত্যিমধ্যে ৯ বাংলাদেশি সহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন বেঁচে ফিরা এক বাংলাদেশি। তবে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রার পর শেষ পর্যন্ত ২৯ বাংলাদেশি পৌঁছান মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে। ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা সেই যাত্রার পর স্বস্তির খবর এসেছে স্বজনদের জন্য। ২৯ জনের মধ্যে ২৭ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৪ জনই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। 

পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ২৭ জনই বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন। তারা মিশরের স্থানীয় পুলিশের হেফাজতে আছেন। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর তাদের বেঁচে থাকার খবর স্বস্তি ফিরিয়েছে। তবে আনন্দের পাশাপাশি রয়ে গেছে দুশ্চিন্তাও। কারণ বাকি দুই বাংলাদেশি এখনো মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।  

জীবিত উদ্ধার হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশী সুনামগঞ্জের আব্দুল করিমর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,নৌকাটিতে থাকা আরো ৯ বাংলাদেশি নাগরিক সাগরে মারা গেছেন এবং তাদের মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। 

জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট মানবপাচার চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার তবুক এলাকা থেকে একটি নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন বাংলাদেশিসহ অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর এটি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। প্রায় ১০ দিন সাগরে ভাসমান থাকার পর গত ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। পরে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় বাংলাদেশি নাগরিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

পুলিশ হেফাজতে থাকা ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে সিলেট বিভাগের চার জেলার মোট ২৪ জন রয়েছেন।

তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জ সদরের ১২ জন।

তারা হলেন, তায়েবুর রহমান, মো. মাহফুজ মিয়া, মো. লোহানী আহমেদ, বদর উদ্দিন, সোহেল মিয়া, মো. হোসাইন আহমেদ, আলিম উদ্দিন, সাব্বির হোসেন তালহা, এনাম উদ্দিন, আবু সাঈদ এয়াহিয়া, আব্দুল করিম ও মো. মামুন খান। সুনামগঞ্জের দিরাই থেকে নাইম আহমেদ, জগন্নাথপুর থেকে সাইদুল ইসলাম, মো. হোসাইন মিয়া, আরিফ আহমেদ ও হুজাইফা বিন হোসাইন এবং ছাতক থেকে তোফায়েল আহমেদ রয়েছেন তালিকায়।


হবিগঞ্জ থেকে রয়েছেন, সদরের মোস্তাকিন ভূঁইয়া এবং আজমিরীগঞ্জের সোহেল মিয়া ও রিয়াজ উদ্দিন আহমদ। সিলেট জেলা থেকে রয়েছেন গোয়াইনঘাটের তানভীর হোসেন এবং বিয়ানীবাজারের রাজু মিয়া ও নজরুল ইসলাম।

সিলেট বিভাগের বাইরে থাকা বাকি তিনজন হলেন, মাদারীপুরের মো. ফারুক, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের সায়মন মিয়া এবং ভৈরবের মহরম আলী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা আরো দুই বাংলাদেশি নাগরিকের নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানান, মানবপাচার চক্রের সহায়তায় গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবুক এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকাটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পথে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং গত ১৩ আগস্ট মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে ২৭ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তারা মারসা মাতরুহ পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি অস্থায়ী কারাগারে আটক রয়েছেন।

জাকির হোসেন জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাকি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবে সুস্থ হয়ে পুলিশ হেফাজতে থাকাদের ছবি ও ঠিকানা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে।

দূতাবাসের এই কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মেহেদি হাসান (পিতা মো. সাবু মিয়া) মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে গত ১৬ আগস্ট বিকেলে একই উপকূল থেকে আরো এক বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে দুটি মরদেহ মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষিত রয়েছে।

মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং সাগরে নিখোঁজ নয় বাংলাদেশির নাম-পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য জীবিত উদ্ধার হওয়া সহযাত্রীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া জরুরি বলে জানিয়েছেন দূতাবাসের কর্মকর্তা। এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এছাড়া, নৌকা থেকে শামীম আহমেদ ও হাবিব উল্লাহ নামের দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং হৃদয় পাল, মো. হাবিব উল্লাহ ও নুর আলম নামের তিনটি পাসপোর্ট পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

জাকির হোসেন বলেন, “মিশরের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালত ও প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্তের পর আটক ২৭ বাংলাদেশির বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে মর্গে সংরক্ষিত দুই মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠানো এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”