ছবিঃ ওয়ান টিভি
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের সিংহনাদ গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির এক প্রাচীন বৃক্ষ। স্থানীয়দের কাছে এটি বুড়া ঠাকুর’ কিংবা ‘পাঁচগাছি নামে পরিচিত। শত বছরের পুরোনো এই বৃক্ষকে ঘিরে রয়েছে ধর্মীয় আচার, পূজা, মানত, মেলা ও নানা লোককথা। এসব বিশ্বাস ও কিংবদন্তির কারণে গাছটি স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছেও কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় তিন কেদার জমিজুড়ে বিস্তৃত এ বৃক্ষের বয়স সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির বিশাল শিকড় ও বিস্তৃত ডালপালা দেখে এর দীর্ঘ অস্তিত্বের ধারণা পাওয়া যায়। আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হিজলগাছও। বৃক্ষটির মূল শিকড়ের পাশে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। সেখানে নিয়মিত ভক্তরা পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও মানত করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিরাই-সুনামগঞ্জের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও মানুষ এখানে মানত ও পূজা দিতে আসেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাবেন্দ্র তালুকদার বলেন, ‘বুড়া ঠাকুরকে ঘিরে এলাকার মানুষের বিশ্বাস অনেক পুরোনো। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, দূর-দূরান্তের মানুষ এখানে এসে মানত করেন। মানত পূরণ হলে আবার এসে পূজা দেন।
পাঁচ না ছয়, পাথর নিয়েও রহস্য বৃক্ষটির আশপাশে থাকা কয়েকটি পাথর নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা কৌতূহল। কারও দাবি, কখনো সেখানে পাঁচটি, আবার কখনো ছয়টি পাথর দেখা যায়। তবে এসব পাথরের উৎস বা সংখ্যার পরিবর্তনের কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা স্থানীয়দের জানা নেই।
স্থানীয় লিলু বিশ্বাস বলেন, ছোটবেলা থেকেই পাথরগুলোর কথা শুনে আসছেন। কখনো পাঁচটি, কখনো ছয়টি দেখা যায়।এমন কথাই মানুষের মুখে শুনেছেন।
বিলের সিন্দুকের গল্প ‘বুড়া ঠাকুর’ গাছের পেছনে রয়েছে একটি বড় বিল। এ বিলকে ঘিরেও প্রচলিত রয়েছে নানা লোককথা। গ্রামের প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একসময় বিলের পানিতে নাকি সিন্দুক ভেসে উঠত। কথিত আছে, এসব সিন্দুকের মধ্যে ছিল সোনার তৈরি বিভিন্ন পূজার সামগ্রী।
গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল দাস রায় বলেন, গাছটির বয়স সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। আগের প্রজন্মের কাছ থেকে বিলের সিন্দুকের গল্প শুনেছেন।
পূজা দিতে আসা ভক্তদের প্রয়োজনীয় বাসন না থাকলে মহিলারা উলুধ্বনি দিলে পানিতে তা ভেসে উঠত এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব ঘটনা তাঁরা নিজের চোখে দেখেননি। স্থানীয়দের এসব দাবির কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে সিন্দুক, সোনার পূজাসামগ্রী কিংবা পানিতে বাসন ভেসে ওঠার ঘটনাগুলোকে লোককথা ও স্থানীয় কিংবদন্তি হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
চৈত্রের প্রথম রবিবার বসে মেলা ‘বুড়া ঠাকুর’কে ঘিরে রয়েছে নিয়মিত ধর্মীয় আয়োজন।
স্থানীয় বেণু মাধব তালুকদার জানান, প্রতি বছর চৈত্র মাসের প্রথম রবিবার এখানে মহাদেবের পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে বসে বড় মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এতে অংশ নেন। তিনি বলেন, মেলা উপলক্ষে গাছটির সামনের বিশাল মাঠজুড়ে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট বসে। শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। মেলার অন্যতম আয়োজন হলো পাঠা বলি। মানত পূরণের অংশ হিসেবে অনেক ভক্ত পাঠা নিয়ে আসেন।
নিয়মিত ভক্ত জিবেশ বৈদ্য বলেন, চৈত্র মাসের প্রথম রবিবারের মেলাটি তাঁদের কাছে বিশেষ। এটি শুধু পূজা নয়, মানুষের মিলনমেলাও। এ সময় দূর-দূরান্তের আত্মীয়স্বজন ও ভক্তরা এখানে আসেন।
শতবর্ষী এই বৃক্ষের প্রকৃত বয়স, পাথরের সংখ্যা পরিবর্তন কিংবা বিলের সিন্দুকের গল্পের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও লোককথার সঙ্গে মিশে বুড়া ঠাকুর, আজ সিংহনাদ গ্রামের একটি ঐতিহ্য ও কৌতূহলের স্থান হিসেবে টিকে আছে।
ওয়ান টিভি / মনোয়ার