ছবি : ওয়ান টিভি
দেশের সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জ। ৩ হাজার ৭৪৭.১৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জেলার ১২ উপজেলায় প্রায় ২৯ লাখ মানুষের বসবাস। হাওর ও দুর্গম এলাকা থেকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে আসেন রোগীরা। বর্তমানে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠেছে।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, এখানে চিকিৎসকের পদ ৭৪টি থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। নার্সের পদ ২৬৩টি, কর্মরত আছেন ১৯৩ জন। এছাড়া, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য ১৩৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৮ জন। অনেক বিভাগে সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট নেই।
এমন সংকটের মধ্যেই সম্প্রতি পাঁচজন চিকিৎসককে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছে। অথচ সেখানে এখনো হাসপাতালই চালু হয়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একপর্যায়ে তাদের সেখানে বদলি করা হয়। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে ধারণক্ষমতার চেয়ে অন্তত তিন গুণ রোগীর চাপ সামলানো চিকিৎসকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, জেলার দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসলেও সময় মতো পাওয়া যায় না বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। চিকিৎসকসহ লোকবল সংকট থাকায় সেবা নিতে আসা রোগীরা পড়েছেন ভোগান্তিতে৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সেবা মিলছে না। অনেকসময় ডাক্তারদের নাগাল না পাওয়ায় চিকিৎসা না পেয়েই বাড়ি ফিরছেন তারা। যাদের সমর্থ্য আছে, তারা যাচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।
জেলার বিশ্বম্ভরপুর থেকে তিন মাসের শিশু সন্তানকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসেন বুরহান উদ্দিন নামে এক বাবা। তিনি বলেন, “গত দুইদিন হলো এই হাসপাতালে এসেছি। এখানে এসে দেখি, রোগীর প্রচণ্ড ভিড়। বেড তো দূরের কথা, ঠিকমতো দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া যাচ্ছে না। বাচ্চাটাকে সুস্থ করতে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে ডাক্তার পাওয়া যায় না। আমরা হাসপাতালে এসে যদি ডাক্তার না পাই, তাহলে এখানে এসে লাভ কি।”
আরেক রোগীর স্বজন হাফসা বেগম বলেন, “অসুস্থ বাচ্চাকে সুস্থ করতে এখানে নিয়ে এসেছি। একটা বেডের জন্য অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। ওয়ার্ডের ভেতরে বাইরে জায়গা নেই, করিডোরেও রোগী। বারান্দায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে কেমন কষ্ট হচ্ছে কিভাবে বুঝাব। এর মধ্যে পাঁচ তলার বাথরুম নষ্ট, বাচ্চাকে এই বারান্দায় রেখে ছয় তলার বাথরুমে যেতে হয়। এই দৌঁড়াদৌঁড়িতে নিজেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।”
জনবল সংকট ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালে সদস্য চালু হওয়া আইসিইউ সেবা। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালের জনবল সংকট নিরসন করে পর্যপ্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার দাবি স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকদের।
স্থানীয় বাসিন্দা তৈবুর রহমান বলেন, “আমাদের হাওরে জেলার মানুষের দুঃখ আর কষ্টের শেষ নেই। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে আসেন। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালের জায়গা ও সুযোগ-সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়েনি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। ”
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহম্মদ হোসেন বলেন, “হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যেও আমরা সীমিত জনবল নিয়েও সাধ্য মতো সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ এর চেয়ে বেশি রোগী আসেন। এর মধ্যে হামের রোগীও আছে। তবুও, আমরা চেষ্টা করছি। ” লোকবল নিয়োগের প্রস্তাবনা মন্ত্রণায়ে পাঠানোর কথা জানান তিনি।