ছবি : ওয়ানটিভি
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় সরকারকে প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েও উপজেলা প্রশাসনের বে-আইনী হস্তক্ষেপ ও প্রভাবে মৎস্য আহরণ করতে পারছেন না কালীজানা বিলের মৎস্যজীবীরা। জলমহালের পাশ্ববর্তী জলাভূমি ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আদালতে আদেশ অমান্য করে নামমাত্র টাকার বিনিময়ে দেয়া হয়েছে ইজারা। ফলে কোটি টাকার জলমহালের ইজারদারদের সাথে তৈরি হয়েছে হাজার টাকার জলাশয় ইজারাদারের দ্বন্দ্ব। জলমহালের মাছ ধরতে জাল ফেললে পুলিশ পাঠিয়ে মৎস্য আহরণ বন্ধ করে দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কালীজানা বিল গ্রুপের মৎস্যজীবীরা। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কেবল একটি রাজনৈতিক মহলকে সুবিধা দিতে বেয়াআইনীভাবে জলমহাল সংলগ্ন জলাশয় ইজারা দিয়ে দ্বন্দ্বের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ভূমি অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এদিকে কোটি টাকার জলমহালে মাছ আহরণ করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে মৎস্যজীবীরা। তাছাড়া মৎস্য আহরণ দ্বন্দ্বে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে জলমহাল এলাকায়। যেকোনো সময় ঘটতে পারে আইনশৃঙ্খলা অবনতির মতো অরাজক পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী ও সাধারণ মৎস্যজীবীরা।
জানা যায়, ধর্মপাশা উপজেলার মাটিকাটা বীর উত্তর এলাকায় ১৪টি মৌজায় খালিজানা বিল গ্রুপের এন ২৮১.৫৯ একর বিল-নালা-ডোবা- খাল (১৪৩১-১৪৩৩) বাংলা সনে ৩ বছর মেয়াদে ইজারা নেয় কালীজানা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। তিন বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকার রাজস্ব দেয়ার মাধ্যমে
জলমহালটি ইজারা প্রাপ্ত হলেও
জলমহালের পাশ্ববর্তী খাস জলাভূমির মালিকানা নিয়ো বিপাকে পড়েন সংশ্লিষ্টরা। গত বছরের ১৭ এপ্রিল পাশ্ববর্তী ইজারাবিহীন জলাভূমি খাজনা গ্রহনের মাধ্যমে বন্দোবস্ত প্রাপ্তিতে জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক বরাবরে
আবেদন করলেও সাড়া মেলেনি কর্তৃপক্ষের। ফলশ্রুতিতে উচ্চ আদালতের দারস্ত হয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। সমিতির দায়ের করা রিটপিটিশন মামলায় গত বছরের ২৩ নভেম্বর জলাভূমিতে খাসকালেকশন আদায় স্থগিতের আদেশ দেন উচ্চ আদালত। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল স্থগিতাদেশ ৬ মাসের জন্য বৃদ্ধি করলেও আদালতের আদেশ অমান্য করে ১০ জুলাই ৪৫৬১ দাগে ৬.৩০ একর এবং ১৪ জুলাই ৮৭,৭৩,৫২ দাগে ৭.৩২ একর ও ৮৭,৭৩,১০০১ ও ১১৪১ দাগে ১১.২৯ একর জলাভূমি নামমাত্র টাকায় অস্থায়ি খাস কালেকশান প্রদান করে উপজেলা সহকারী ভূমি কমিশনার সঞ্জয় ঘোষ।
সূত্র বলছে, জলমহালের পাশ্ববর্তী জলাভূমি ইজারা দেয়ার বিধান না থাকলেও উচ্চ আদালতে আদেশ অমান্য করে ক্ষমতাশীন দলের নেতাকর্মীদের সুবিধা দিতে নামমাত্র টাকায় জলাভূমি ইজারা দিয়েছে প্রশাসন।
রবিবার সরেজমিনে কালীজানা জলমহালে গিয়ে দেখা যায়,কালিজানা গ্রুপ পিশারির অন্তর্গত মনাই নদীর ভাটি মাছ আহরণ করতে কালিজানা মৎস্যজীবী সমিতির পক্ষ থেকে জাল বসানো হলে একটি পক্ষ এসে বাঁধা দেয়। তারা নিজেদের খাসকালেকশনের মাধ্যমে জলাভূমির মালিক দাবি করেন। জানা যায়, বাঁধা প্রয়োগকারীর ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হলেও পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে জলাভূমি থেকে জাল তুলে নিতে বাধ্য করে মৎস্যজীবী সমিতির সংশ্লিষ্টদের
কালিজানা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমদ বলেন, সরকারকে এতে টাকা দিয়ে রাজস্ব জলমহাল ইজারা এনেছি। সম পরিমাণ টাকা বিল সাজাতে ব্যয় হয়েছে। এখন যখন মাছ ধরার সময় মাছ ধরার সময় মাছ ধরতে পারছিনা। বেয়াআইনীভাবে খাস কালেকশন দিয়ে মাছ আহরণে বাঁধা দেয়া হচ্ছে। পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। উচ্চ আদালত খাস কালেকশন স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিলেও রহস্যজনক কারনে প্রশাসন এটি মানেনি। এখন মাছ ধরার সময়। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। আমরা মৎস্যজীবী মানুষ। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রশাসন আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন এমনটা আমরা প্রত্যাশা করি।
টুটুল মিয়া নামের এক মৎস্যজীবী বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে সরকারের কাছ থেকে বিল এনে এভাবে মাছ ধরেছি। কিন্তু হঠাৎ খাসকালেকশনের নামে আমাদের বাঁধা দেয়া হচ্ছে। আমরা অনেকদিন ধরে কর্মহীন হয়ে আছি। এভাবে চলতে থাকলে ইজারাদারের যেমন ক্ষতি তেমনি আমাদেরও ক্ষতি। আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
ইমরান হোসেন নামের আরেক মৎস্যজীবী বলেন,মাছ মৌসুম চলে গেলে লাভ কি হবে। দ্রুত মাছ ধরার ব্যবস্থা না করে দিলে কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হবে আমাদের। আমরা এই লোকশান কি করে উঠাবো।
এদিকে খাসকালেকশনে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলেও সহকারী ভূমি কমিশনার ভূলক্রমে ইজারা দিয়েছেন বলে দায় স্বীকার করে পরবর্তীতে ইজারা বাতিলের কথা জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায়। তবে তাৎক্ষনিক খাসকালেকশান বাতিলের কোনো ডুকুমেন্ট না দেখাতে পারলেও পরদিন হোয়াটসস্যাপে পাঠিয়ে দেন তিনি। যেখানে দেখা যায়, ৬ সেপ্টম্বর সাক্ষরিত পত্রে খাসকালেকশান বাতিল করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্বকে অবহিত করা হয়।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, কালিজানা জলমহালে স্থানীয় প্রশাসন আইনের ব্যক্তয় করেছেন। তারা কোনোভাবে জলমহালের পাশ্ববর্তী জলাভূমি ইজারা দিতে পারেননা। আমি বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানিয়েছি। ইতোমধ্যেই খাস কালেকশান বাতিল করা হয়েছে। সমাধান না হলে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে কথা বলে বিহীত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের মুঠোফোন কল করা হলেও রিসিভ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।