প্রকাশিত : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:৩০ (শুক্রবার)
রাজপথ থেকে সংসদে কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন

ছবি : ওয়ানটিভি

আনোয়ার হোসেন,রনি

হাওর,প্রাকৃ‌তির সম্প‌দের ভরপুর,আউল বাউল উবর ভূ‌মি একটি জনপদের রাজনীতি কখনো শুধু নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা, ভালোবাসা, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অসংখ্য স্মৃতি। একজন রাজনীতিকের পথচলা তখন হয়ে ওঠে সেই জনপদেরই গল্প। 

সুনামগঞ্জ-৫(ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন জাতীয় সংসদের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় তাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব পাওয়ায় ছাতক ও দোয়ারাবাজারের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।

কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন বিষয় সংসদীয় পর্যায়ে পর্যালোচনা, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

তার রাজনীতিতে এম‌পি কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের দীর্ঘ পথচলাও যেন তেমনই এক গল্প—সংগ্রাম, উত্থান-পতন, জয়-পরাজয় আর মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ের গল্প।

ছাতক পে‌ৗর শহ‌রের বাগবাড়িতে তার জন্ম নেওয়া কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন শৈশব থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই আকর্ষণ পরিণত হয় সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায়।

 চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিনি সরাসরি রাজনীতির মাঠে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম (অনার্স) এবং হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি ফিরে আসেন নিজের মানুষের কাছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করে স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তাঁর মন পড়ে ছিল রাজনীতির মাঠে। মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে টেনে নেয় জনসম্পৃক্ত রাজনীতির পথে।

তরুণ বয়সেই সংসদে !

কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের রাজনৈতিক জীবনের একটি বিস্ময়কর অধ্যায় শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। ওই বছর চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তরুণ বয়সে জাতীয় সংসদে প্রবেশ তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

তবে রাজনীতির পথ তাঁর জন্য কখনো মসৃণ ছিল না। সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পথ। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি জেলার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জয়-পরাজয়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা!
রাজনীতিতে জয় যেমন আছে, তেমনি আছে পরাজয়। কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের রাজনৈতিক জীবনেও এই দুই অভিজ্ঞতা পাশাপাশি হেঁটেছে।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সুনামগঞ্জ-৫ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আবারও সংসদে ফেরেন। সেই বিজয় ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

কিন্তু একই বছর ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুহিবুর রহমান ওই নির্বাচনে জয়ী হন।

পরাজয় তাঁকে থামিয়ে দেয়নি। বরং রাজনৈতিক মাঠে আরও সক্রিয় হয়েছেন তিনি। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও বিএনপির প্রার্থী হন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মজিবুর রহমান মানিককে পরাজিত করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এটি ছিল আরেকটি বড় প্রত্যাবর্তন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহিবুর রহমান মানিক বিজয়ী হন। আবারও পরাজয় আসে। কিন্তু রাজনীতি থেকে সরে যাননি তিনি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও সংসদেন!
রাজনীতিতে অনেক সময় একটি বিজয়ের পেছনে থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা। কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের ক্ষেত্রেও যেন সেটিই সত্য। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। নির্বাচনে ১ লাখ ৫১ হাজার ৯১৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী পান ১ লাখ ২ হাজার ১২১ ভোট।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, একাধিক নির্বাচনে জয়-পরাজয় এবং মাঠের রাজনীতির নানা অভিজ্ঞতার পর এই বিজয় তাঁকে আবারও জাতীয় সংসদে ফিরিয়ে আনে। তাঁর অনুসারীদের কাছে এটি শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি আবেগঘন প্রত্যাবর্তন।

রাজনীতির বাইরে একজন পরিবারপ্রেমী মানুষ
রাজনীতির ব্যস্ততার আড়ালে কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের রয়েছে একটি পারিবারিক জগৎ। তিনি তিন কন্যার জনক। তাঁর তিন মেয়েই উচ্চশিক্ষিত এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

বড় মেয়ে মৌ একজন ব্যাংকার। দ্বিতীয় মেয়ে মাহি জার্মানিতে ডক্টরেট করছেন। তৃতীয় মেয়ে মিম একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিন মেয়েই বিবাহিত।

রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি একজন বাবার জীবনে আলাদা আনন্দের জায়গা তৈরি করেছে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের এই অর্জন নিঃসন্দেহে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি।

মানুষের প্রত্যাশার জায়গায় মিলন! 
একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। ছাতক-দোয়ারাবাজারের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, যুবকদের কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, খাল খনন এবং জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছেন।

ছাতক-দোয়ারাবাজারের মতো একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক চিকিৎসাসেবা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক নিরাপত্তা। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখাই এখন তাঁর সামনে বড় দায়িত্ব।

নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যাশা! 
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব শুধু নিজ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সর্বশেষ তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
এই দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নিজের এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের সামনে তাই এখন একই সঙ্গে দুটি বড় দায়িত্ব—জাতীয় রাজনীতিতে নিজের ভূমিকা আরও কার্যকর করা এবং ছাতক-দোয়ারাবাজারের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।

রাজপথ ও সংগ্রাম থেকে সংসদে !
একজন কলিমউদ্দিন আহমদ মিলনের গল্প শুধু কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফল নয়। এটি দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক পথচলার গল্প। ছাত্রজীবনের রাজনীতি থেকে সংসদে প্রবেশ, দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, নির্বাচনে জয়, পরাজয় এবং আবারও ফিরে আসা—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন তৈরি করেছে নানা অধ্যায়ের সমন্বয়ে।

১৯৮৮ সালে যে তরুণ রাজনীতির মাঠ থেকে জাতীয় সংসদে পা রেখেছিলেন, কয়েক দশক পরও তিনি সেই মাঠেই সক্রিয়। সময় বদলেছে, রাজনীতির ভাষা বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে; কিন্তু মানুষের সঙ্গে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা অব্যাহত রয়েছে।

আজ কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন শুধু একজন সংসদ সদস্য নন—তিনি ছাতক-দোয়ারাবাজারের মানুষের প্রত্যাশার একটি বড় নাম। তাঁর সামনে যেমন অতীতের অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে ভবিষ্যতের বড় দায়িত্ব।
সংগ্রামের পথ পেরিয়ে সংসদে ফিরে আসা এই রাজনীতিকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতিদান তিনি কতটা দিতে পারবেন। উত্তরটি সময়ই দেবে। তবে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আবারও জাতীয় সংসদে ফিরে আসার গল্পটি নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। একজন কলিমউদ্দিন আহমদ মিলন—তাই শুধু একটি নাম নয়; এটি ছাতক-দোয়ারাবাজারের রাজনীতির দীর্ঘ এক অধ্যায়ের নাম।