ছবি : সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি। অথচ সুনামগঞ্জের কোরবানির হাটগুলোতে এখনো দেখা মেলেনি সেই চিরচেনা জমজমাট পরিবেশের। প্রতি বছর ঈদের আগমুহূর্তে হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও এবার অনেকটাই ভিন্ন চিত্র। হাওরাঞ্চলে টানা অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এর বড় প্রভাব পড়েছে কোরবানির বাজারে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এবার সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। বছরের প্রধান ফসল হারিয়ে অনেক পরিবারই আর্থিক সংকটে দিন পার করছেন। কেউ কেউ কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকে সামর্থ্যের মধ্যে পশু খুঁজতে হাটে এলেও চড়া দামের কারণে কাঙ্ক্ষিত পশু কিনতে পারছেন না।
হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকলেও দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ক্রেতারা দীর্ঘ সময় দরদাম করছেন। অনেকেই এক হাট থেকে আরেক হাটে ঘুরেও সাধ্যের মধ্যে পশু পাচ্ছেন না। ফলে হতাশ হয়ে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে অনেককে। অন্যদিকে বিক্রেতারাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। লালন-পালনে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় তারা কম দামে পশু ছাড়তে রাজি নন। তবে প্রত্যাশিত ক্রেতা না আসায় শেষ মুহূর্তে বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী। সব মিলিয়ে, হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব এবার সুনামগঞ্জের কোরবানির হাটে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ঈদের আনন্দের মাঝেও অনেক পরিবারের মুখে দেখা যাচ্ছে অর্থনৈতিক সংকটের চাপ ও অনিশ্চয়তার ছাপ।
ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম অনেক বেশি হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা। তবে খামারি ও ব্যাপারীদের দাবি, গো-খাদ্য, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ও পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তাদের বেশি দাম চাইতে হচ্ছে।প্রত্যাশিত দাম না পেলে লোকসান গুনতে হবে বলে জানান তারা।
একাধিক পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার হাটে পশু উঠেছে কিছুটা কম। সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা ছোট ও মাঝারি প্রকৃতির ষাঁড় গরুর দাম এবার বেশ চড়া, যা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ক্রেতারা জানান, গত বছর যে গরু ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার তা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্রেতারা এক হাট থেকে অন্য হাটে ঘুরে ঘুরে বাজার যাচাই করছেন।
শহরের উকিলপাড়ার সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের হাটে কোরবানির পশু কিনতে এসেছেন ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সুমেল আহমেদ। তিনি বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম অনেক বেশি। ছোট ও মাঝারি গরুর দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। হাটে এসে কয়েকটা গরু দেখেছি, কিন্তু মনের মতো দামে পাচ্ছি না। তাই দরদাম করে অন্য হাটে যাচ্ছি।”
একই হাটে আসা ক্রেতা বোরহান উদ্দিন শুভ বলেন, “হাওরে ফসল ডুবে যাওয়ার কারণে আমাদের আর্থিক অবস্থা এমনিতেই খারাপ। তারপরও কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কিন্তু বাজারে পশুর যে দাম, তাতে মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য কোরবানি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।”
শান্তিগঞ্জ উপজেলা থেকে হাটে গরু নিয়ে আসা বিক্রেতা ফারুক মিয়া জানান, “এবার গো-খাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ও ওষুধের খরচও বেশি। তাই বাধ্য হয়েই গরুর দাম একটু বেশি বলতে হচ্ছে।”
সদর উপজেলার খামারি রাব্বি আলম বলেন, “গরুর দাম বেশি না, এটা আমাদের কষ্টের দাম চাচ্ছি। আমরা সারা বছর কষ্ট করে গরু লালন-পালন করি। এখন যদি প্রত্যাশিত দাম না পাই, তাহলে লোকসান গুনতে হবে। এছাড়া পরিবহন খরচও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।”
সুনামগঞ্জের জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইমলাম বলেন, “জেলায় কোরবানিকে সামনে রেখে পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। জেলার ১২ উপজেলায় স্থায়ী ২৬টি ও অস্থায়ী ৩৪টি পশুর হাট বসেছে। স্থানীয় খামারিদের মাধ্যমে প্রায় ৫৩ হাজার পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। কোরবানির চাহিদা পূরণ হওয়ার পরও কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আশা করছি।”
পশুর হাটে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, জালনোট প্রতিরোধ, চুরিসহ অপরাধমুলক কাজ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে জানান সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রতন শেখ।