https://onetv24.com/

1033

one-tv-special

ওয়ান টিভি স্পেশাল

জলের দেশে শিক্ষার ডুবোচর: হাওরেই তলিয়ে যাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ ২১:৪৩
প্রতিবেদক: এস এম মিজান

ছবি: প্রতীকী

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগরসহ হাওরাঞ্চলে বর্ষা এলেই বদলে যায় জনজীবনের চিত্র। বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলে যাওয়া হয়ে পড়ে দুরূহ। নৌকা না থাকলে ১-২ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলো খালি পড়ে থাকে। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে যেন ফুটিয়ে তোলে বহুল প্রচলিত প্রবাদ "বর্ষায় নাও, হেমন্তে পা"। হাওরবাসীর কাছে এটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

 হাওরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুম (জুন-সেপ্টেম্বর) শুরু হলেই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটের কারণে এ সময়ে অনেক স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি নেমে আসে মাত্র ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশে। অথচ শুষ্ক মৌসুমে একই বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতির হার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই মৌসুমি প্রতিবন্ধকতা হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী সুনামগঞ্জ জেলার শিক্ষার হার ৬৪.৯২ শতাংশ যেখানে জাতীয় পর্যায়ে গড় শিক্ষার হার ৭৪.৮০ শতাংশ।     শিক্ষার সব সূচকে সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে তলানিতে। সাক্ষরতার হার ৬৪.৭৭ শতাংশ জাতীয় গড় ৭৪.৭ শতাংশ থেকে অনেক পিছিয়ে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ২৮-৩২ শতাংশ  যেখানে জাতীয় গড় ১৯.৯ শতাংশ  হাওর উপজেলায় এটা প্রায় ৪০ শতাংশ ছাড়ায়।

বৈশাখ শেষে বর্ষাকাল আসলে বিভিন্ন স্কুলে উপস্থিতির হার অনেক কমে যায়। খাল-বিলের পানি, বৃষ্টি, বন্যা, নৌকা ডুবির ভয়, অভিভাবকদের অসচেতনতা সহ বিভিন্ন কারনে ঝরে পড়ে শিক্ষার্থীরা।

তাহিরপুর উপজেলার খালাশ্রীপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রুপা ওয়ান টিভিকে জানায়, “বর্ষাকাল এলেই স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। সব সময় নৌকা পাওয়া যায় না, তাই অনেক সময় টানা দুই-তিন মাস বিদ্যালয়ে যেতে পারি না। পরে স্কুলে গেলে আগের পড়াগুলো বুঝতে সমস্যা হয়, আর সব সময় সেগুলো ঠিকমতো বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগও থাকে না।”

টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের গোলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মুসলিম উদ্দিন ওয়ান টিভি-কে বলেন, “আমাদের গ্রামে স্কুল নেই তাই পাশের গ্রামে বাচ্চাদেরকে স্কুলে দিয়ে আসতে হয়। নৌকা ছাড়া কোনভাবেই যাওয়া সম্ভব হয়না। এছাড়াও দিন খারাপ করলে ঢেউয়ে নৌকা ডুবার ভয় থাকে।”

জয়পুর গ্রামের শিহাব আহমদ  ওয়ান টিভি-কে বলেন, “আমাদের চার গ্রামের জন্য মাত্র একটি স্কুল তাও একেক গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১ কিলোমিটারের কাছাকাছি। হাওরের পানি এবং ঢেউ মাড়িয়ে স্কুলে যাওয়া শিশুদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে এছাড়া সব অভিভাবকরাও সচেতন না। অনেকেই স্কুলে নিয়ে যেতে চায় না।”

জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন,“বর্ষাকালের ছয় মাস ছাত্র ছাত্রীর উপস্থিতি কমে যায়। প্রতিটি গ্রাম থেকে স্কুলে আসতে নৌকা প্রয়োজন হয় কিন্তু স্কুলের জন্য আলাদা নৌকার কোন ব্যবস্থা নেই। যার কারনে উপস্থিতি কম থাকে। এছাড়া শিক্ষক সংকটের কারনেও পড়াশোনায় ব্যতয় ঘটে। তিনি বলেন, ১২৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র দুজন শিক্ষক। ক্লাশ পরীক্ষা এসব করতে হিমশিম খেতে হয়।”

তাহিরপুর উপজেলার শান্তিপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক তৈফুল ইসলাম হোসেন বলেন,“বর্ষাকালে অনেক গ্রামীন রাস্তার খালে পানি থাকে। ছোট ছোট শিশুরা বুক পরিমান পানি পেরিয়ে আসতে পারে না। এছাড়াও মাছ ধরার মৌসুমে অনেক শিশু অভিভাবকদের সাথে হাওরে চলে যায়। কেউ আবার ভাসমান কয়লা কুড়ে কেউ বালু উত্তোলন করে।”

শিক্ষকরা বলছেন, বর্ষাকালে টানা তিন-চার মাস নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে না পারায় প্রত্যন্ত ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় চরমভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং একপর্যায়ে স্থায়ীভাবে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা। তাঁদের মতে, ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে এই দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা ক্লাসের বাইরে থাকে, যার ফলে পড়ালেখার ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর বিদ্যালয় খুললে সহপাঠীদের তুলনায় নিজেকে পিছিয়ে পড়া দেখে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে হীনম্মন্যতা ও স্কুলবিমুখতা তৈরি হয়। পড়াশোনার এই ঘাটতি এবং ক্লাসের পড়া ধরতে না পারার মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে অবশেষে একসময় তারা চিরতরে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ে।

শিক্ষক, লেখক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলন তাহিরপুর উপজেলার সভাপতি মোছায়েল আহমদ বলেন, “যুগ যুগ ধরে হাওরাঞ্চলের মানুষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। তিনি প্রধানত বর্ষাকালে স্কুলে ঝড়ে পরার জন্য যোগাযোগ ব্যাবস্থাকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ছোট ডিঙি নৌকায় স্কুলে যাতায়াতের ফলে নৌকা ডুবার অনেক ভয় থাকে এজন্য বড় এবং বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের বাহন দিতে পারলে স্কুলে ঝরে পড়া রোধ সম্ভব।”

অপরদিকে অভিভাবক মহলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাওর পাড়ের এক অভিভাবক বলেন,আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা হলেন রাজা বাদশা, তারা সকাল ৯ টার পরিবর্তে ১২ টায় আসেন। কোনমতে হাজিরা দিয়েই আবার চলে যান। বাচ্চারা কি শিখবে?

আনোয়ারপুর গ্রামের জয়নাল জানান, অনেক শিক্ষক সময়মতো আসেন না। বাচ্চাদের প্রতি শিক্ষকরা বর্তমানে অনেক বেশি উদাসীন। আগের মত স্যাররা আন্তরিকতার সাথে স্কুলে শ্রম দেন না।

নৌকায় করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া জামালগঞ্জের বেলীর বাসিন্দা সাহাঙ্গীর মিয়া জানান,একটা সরকারি প্রাথমিক স্কুলের জন্য ৪-৫টা গ্রামের শিক্ষার্থী ছোট নৌকায় করে নিয়ে  আসতে হয়। বর্ষায় সেই দূরত্ব হয়ে যায় মৃত্যুফাঁদ। গত কয়েক বছরে নৌকাডুবিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর অভিভাবকদের আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এখন আমিও ভয় পাই শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসতে।

দক্ষিণ  শ্রীপুর ইউনিয়ন এর মাড়ালা গ্রামের অভিভাবক রাফিউল মিয়া বলেন, নৌকা না থাকলে বাড়ির মেয়ে-শিশুরা স্কুলেই যেতে পারে না। নাও ভাড়া ৪০টা টাকা একজনের পিছে রোজ ৮০ টাকা টাকা খরচ হয়।  কেমনে দিব? দৈনিক মাছ বেচে তিনশত টাকাও রুজি করতে পারিনা।

ওয়ার্ক ফর এডুকেশন ( ডব্লিউএফই) এর পরিচালক মু সুহেল আলম বলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিমুক্তভাবে আসা-যাওয়া করা এবং নিকটবর্তী স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা না গেলে টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গুণগত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে সেটি হাওর অঞ্চলে অর্জন করা সম্ভব হবে না। 

তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুল-কলেজে যায়। অতীতে অনেক নৌ-দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রাণ হারাতে দেখেছি আমরা। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আলাদাভাবে নৌকার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। বর্ষাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে এবং শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

বেসরকারি হাওর উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএস এর উন্নয়ন কর্মী সাইফুল চৌধুরী বলেন, আমরা হাওরাঞ্চলে  কাজ করতে গিয়ে দেখেছি অনেক স্কুলে শিক্ষকদের উপস্থিতি কম থাকে। স্থানীয় পর্যায় থেকে শিক্ষকদের নিয়োগ করা হলে এ সমস্যাটির সমাধান হতে পারে বলে আমি মনে করি।

তাহিরপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সুলেমান মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে যায়। ঝড় বৃষ্টির কারণে শিশুরা স্কুলে আসতে অনেক ভয় পায়। স্কুল থেকে গ্রামের দূরত্ব বেশি এবং অনেক অভিভাবক আছেন যারা কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকা অথবা সিলেট চলে যান শিশুরাও তাদের সাথে চলে যায়।  তিনি আরো বলেন, আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থী অভিভাবক সচেতনতার মাধ্যমে উপস্থিতি বাড়ানো।

সুনামগঞ্জের হাওর শুধু পানির দেশ না, এটা স্বপ্ন ভাসিয়ে দেওয়ার দেশও। বর্ষার চার মাস একটা বাচ্চার শিক্ষাজীবন থেকে মুছে গেলে, সে আর কখনো সেটা ফেরত পায় না। শিক্ষা ছাড়া হাওর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলের জন্য আলাদা শিক্ষা নীতি প্রয়োজন। নৌকা-স্কুল, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম এবং দুর্যোগ-সহনশীল বিদ্যালয় নির্মাণের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণেরও দাবি উঠেছে।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা আজও প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে। একদিকে বন্যা, দারিদ্র্য ও যোগাযোগ সংকট অন্যদিকে শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও স্থানীয় উদ্যোগ এই দুই বাস্তবতার মাঝেই এগিয়ে চলেছে হাওরের শিক্ষার্থীরা। টেকসই পরিকল্পনা ও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই অঞ্চলের শিক্ষা বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। হাওরের শিশুরাও যেন সমান সুযোগে শিক্ষা অর্জন করতে পারে, সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি স্থানীয়দের।  

 

ওয়ান টিভি / মনোয়ার 

🔔 শিরোনাম
ছাতকে অ বৈ ধ ড্রে জা রে র বালু উত্তোলনে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় ৪০টি পরিবার কামব্যাকের মহাকাব্য লিখে ফাইনালে আর্জেন্টিনা দোয়ারাবাজারে ৭৭ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শ ঙ্কা ড্রেজার দিয়ে কুশিয়ারা নদী থেকে চলছে বালু উত্তোলল, হুমকির মুখে একাধিক গ্রাম পাহাড়ি ঢলের চাপে সুনামগঞ্জে জগন্নাথপুরের ৮ গ্রামের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে যে নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে বাড়ছে বন্যার উদ্বেগ  পাহাড় ধ সে অন্তত ১১ জনের মৃ ত্যু বিদ্যুতের ট্রাজিডিতে শোকে মুহ্যমান অনন্তপুর গ্রাম বি দ্যু ৎ স্পৃ ষ্ট হয়ে একই পরিবারের তিনজনের ম র্মা ন্তি ক মৃ ত্যু