ছবিঃ ওয়ান টিভি
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রবেশদ্বারে দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে কোটি টাকা মূল্যের একটি অত্যাধুনিক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স। ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পাওয়া লাইফ সাপোর্ট সুবিধাসম্পন্ন এ অ্যাম্বুলেন্সটি জরুরি রোগী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও চালক ও প্রশিক্ষিত জনবলের সংকটে কখনোই কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়নি। আধুনিক চিকিৎসাসেবার অংশ হিসেবে আনা এই বিশেষায়িত যানটি বছরের পর বছর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে এখন নিজেই যেন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জামটির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলার সাধারণ মানুষ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে সারা দেশে ১০৯টি আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব অ্যাম্বুলেন্স দেশের বিভিন্ন জেলা ও হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এর অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জের দিরাই ও ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি করে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়।
তবে প্রশিক্ষিত জনবল সংকট এবং পরিচালন ব্যয় অত্যধিক হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সগুলো কখনোই ব্যবহার করা হয়নি বলে জানিয়েছে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ধীরে ধীরে এর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ পতাকা সংবলিত অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্সটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনের সামনে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। ধুলোবালি ও অযত্নে এর বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। সিগন্যাল লাইট ভেঙে গেছে। ভেতরে ড্রাইভিং স্টিয়ারিং ও আসনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অনেকগুলোই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্রটি অ্যাম্বুলেন্সটির দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়।এত আধুনিক যানবাহনটি রোগীদের সেবায় কেন ব্যবহার করা হলো না?এমন প্রশ্ন এখন দিরাইয়ের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীর স্বজন ফারিহা জান্নাত জানান,দেখুন রোগী নিয়ে আজ পর্যন্ত সরকারি কোন অ্যাম্বুলেন্স পাইনি।রোগীর মুমূর্ষু অবস্থা থাকলে হাসপাতালে সামনে থাকা গাড়িগুলো সিন্ডিকেট করে টাকা বেশি নেয়।আমরা নিজেদের প্রয়োজনে কোন সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাইনা।কিন্তু এখানে এভাবে নষ্ট হচ্ছে যেন দেখার কেউ নাই।এটি সংস্কার করে রোগীদের সেবা দিক।
এ বিষয়ে দিরাই উপজেলার পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গোলাপ মিয়া ওয়ান টিভিকে বলেন, “দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি হাসপাতালের সামনে পড়ে আছে। কী কারণে এত দামি ও জরুরি সেবার এই যানবাহনটি এভাবে নষ্ট হচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারছি না। শুনতে পাচ্ছি এটি এখন বিকল হয়ে গেছে। সত্যিই যদি যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে থাকে, তবে সেগুলো দ্রুত মেরামত করুন।সরকার ইতোমধ্যে দেশের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নতির ঘোষণা দিয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদন করে এই সমস্যার সমাধান করা দরকার।সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন জসিম উদ্দিন বলেন, জেলার দিরাই ও ছাতকে একটি করে মোট দুটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, যা কয়েক বছর আগে একটি বন্ধু রাষ্ট্রের সহায়তায় পাওয়া যায়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার অভাবে অ্যাম্বুলেন্স দুটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্সগুলোর জ্বালানি ব্যয় অত্যন্ত বেশি। পাশাপাশি সরকারি যানবাহন হিসেবে প্রয়োজনীয় অন্তর্ভুক্তি ও পরিচালনাগত কিছু জটিলতার কারণে সেগুলো সচল রাখা যাচ্ছে না। ফলে অত্যন্ত মূল্যবান এই সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।
সিভিল সার্জন আরও বলেন, ‘আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখেছি, এ বিষয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমিও ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেছি। অ্যাম্বুলেন্স দুটি পরিচালনার জন্য লজিস্টিক সাপোর্ট, জ্বালানি ব্যয় ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান জরুরি। হয় এগুলো আমাদের ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে, না হয় যেখানে ব্যবহার সম্ভব সেখানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জীবনরক্ষাকারী এ ধরনের বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী।