ছবি : সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলা-এর শিমুলবাঁক ইউনিয়ন-এর হাওরবেষ্টিত গ্রাম ঢালাগাঁও। বর্ষাকালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আর শুষ্ক মৌসুমে কৃষিনির্ভর এই জনপদ থেকেই উঠে এসেছেন বাংলাদেশের নারী হকির উদীয়মান তারকা নাদিরা তালুকদার ইমা। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি আজ দেশের নারী হকিতে সম্ভাবনাময় এক নাম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সাফল্য শুধু ঢালাগাঁও নয়, গোটা হাওরাঞ্চলের তরুণীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ নারী হকি দলের ১৬ নম্বর জার্সিধারী এই খেলোয়াড় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। দেশের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং করেছেন ৮টি গোল। বয়সে তরুণ হলেও তার এই অর্জন ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জসহ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বাবা মুসলিম তালুকদার ও মা মাজেদা তালুকদারের নয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ইমা। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তার অদম্য আগ্রহ। পরিবারের উৎসাহ ও নিজের পরিশ্রমের ফলে জাতীয় ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই শুরু হয় তার স্বপ্নপূরণের যাত্রা।
বিকেএসপির কঠোর অনুশীলন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে নিজেকে একজন দক্ষ হকি খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেন ইমা। অল্প সময়ের মধ্যেই বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ এএইচএফ কাপে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিষেক ঘটে তার। প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেই বাংলাদেশ রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। একই বছরের ডিসেম্বরে ওমানে অনুষ্ঠিত জুনিয়র নারী এশিয়া কাপে অংশ নেন তিনি। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০২৫ সালে চীনে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপে অংশ নিতে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে চীন সফর করেন ইমা। সেই সময় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে "হাওরকন্যা" হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। কারণ হাওরপাড়ের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা ছিল সত্যিই অনন্য এক অর্জন। এরপর ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ নারী দল এশিয়ান গেমসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এই সাফল্যের পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইমা। সর্বশেষ জাপানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ নারী হকি দল ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে, যা দেশের নারী হকির ইতিহাসে অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, ইমার সাফল্য শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো সুনামগঞ্জ জেলার গর্ব। তার পথচলা দেখিয়ে দিয়েছে, সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে হাওরাঞ্চলের মেয়েরাও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।
শিক্ষক, অভিভাবক ও ক্রীড়াবিদরা মনে করেন, নাদিরা তালুকদার ইমার গল্প গ্রামের মেয়েদের জন্য এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা। বর্তমানে অনেক পরিবার মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে শুরু করেছে, যার পেছনে ইমার মতো সফল খেলোয়াড়দের অবদান রয়েছে।
হাওরের মাটিতে বেড়ে ওঠা এই তরুণী আজ বাংলাদেশের নারী হকির সম্ভাবনার প্রতীক। ২৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৮ গোল করা ইমার সামনে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি। তবে তার অর্জন ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে—স্বপ্ন দেখতে জানলে এবং সেই স্বপ্নের জন্য লড়তে পারলে হাওরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছানো সম্ভব।
সুনামগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, আগামী দিনে আরও বড় সাফল্য অর্জন করে দেশের পতাকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও উঁচিয়ে ধরবেন হাওরকন্যা নাদিরা তালুকদার ইমা। তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা দেশের নারী হকিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে-এমনই বিশ্বাস সবার। জাপানে আন্তর্জাতিক মিশন শেষে আগামী ১০ জুন দেশে ফিরবেন ইমা ও তাঁর দল। প্রিয় ক্রীড়াবিদকে বরণ করে নিতে এবং তাঁর ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য শুভকামনা জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সুনামগঞ্জবাসী।
ওয়ান টিভি / মনোয়ার