জনবল সংকটে ধুঁকছে পাগলা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র
উপ সহকারী কমিউনিটি অফিসারেই চলে পুরো চিকিৎসা সেবা
ছবি: ওয়ান টিভি
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল পাগলা উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র। উপজেলার পশ্চিম পাগলা, পূর্ব পাগলা, পূর্ব বীরগাঁও, দরগাপাশা ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকার শতাধিক রোগী দৈনিক চিকিৎসা সেবা গ্রহন করেন প্রাচীন এই হাসপাতাল থেকে। সেবা নিতে আসেন ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলার অনেক রোগীও।
তবে জনগুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি ধুঁকছে বহুমুখী সংকটে। হাসপাতালটিতে নেই কোনো মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট, আয়া, অফিস সহায়ক কিংবা নিরাপত্তা প্রহরী। বিশাল জনসংখ্যার বিপরীতে একাই সব সামলাচ্ছেন উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হুমায়ুন কবির। গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা সেবা দেন পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা শাহিনা আক্তার। ফলে রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। এতে চরম ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা।
শুধু চিকিৎসক ও স্টাফ সংকটই নয়, রয়েছে মেডিসিনেরও তীব্র সংকট। চাহিদার বিপরীতে মেডিসিন সরবরাহ হয় খুবই অল্প। সরবরাহকৃত মেডিসিনের মেয়াদোত্তীর্ণের সময়ও থাকে নিকটবর্তী। ফলে অধিকাংশ মেডিসিন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে প্রয়োজনীয় মেডিসিন থেকে বঞ্চিত হন রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১ বছরে ২৬ হাজারেরও বেশি রোগী এই হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়েছেন। এছাড়া নরমাল ডেলিভারীতে এই হাসপাতালেই জন্মগ্রহন করেছে আড়াইশোর অধিক শিশু। চিকিৎসকসহ ৭ জন স্টাফ থাকার কথা থাকলেও এর বিপরীতে আছেন কেবল ১ জন উপ সহকারী মেডিকেল কমিউনিটি অফিসার (SACMO)।
রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খসে পড়ছে ভবনটির দেয়ালের পঁরেস্তার, ভেঙ্গে পড়ে আছে জানালার গ্লাস, জং ধরেছে দরজা-জানালায়। পুরনো ভাঙ্গা আসপাবপত্রেই চলছে নিত্যদিনের কাজ। জরাজীর্ণ ভবনের একটি কক্ষে একের পর এক রোগী দেখছেন হুমায়ুন কবির। তাঁর রুম ছাড়াও পুরো হাসপাতালে রুগীদের উপচে পড়া ভীড়। একই দৃশ্য পরিবার কল্যান পরিদর্শিকা শাহিনা আক্তারের কক্ষেও।
পাশের কক্ষেই রোগীদের ঔষধ দিচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে আসা 'অল্প লেখাপড়া জানা' শাহাব উদ্দিন। ফার্মাসিস্ট না থাকায় এই কাজ করতে হয় তাকে। তবে শাহাব উদ্দিনের মাধ্যমে ঔষধ বিতরণ কার্যক্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন অনেকে। তারা বলছেন, ব্যবস্থাপত্রের লেখা বুঝার মতো 'শিক্ষাগত যোগ্যতা' নেই শাহাব উদ্দিনের। এতে অনেক সময় তিনি ভুল মেসিডিন বিতরণ করে থাকেন যা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
হরিনগর গ্রামের আব্দুল মঈন ও শত্রুমর্দন গ্রামের বদরুল আলম টিপু বলেন, এই হাসপাতালে প্রচুর রোগী আছেন। কিন্তু এখানে কোনো মেডিকেল অফিসার নাই। উপ সহকারী কমিউনিটি অফিসার যিনি আছেন তিনিই সব রোগী দেখেন। এতে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।
স্থানীয় রাজনীতিবিদ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আনছার উদ্দিন বলেন, 'প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্য পাগলা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ এখানে কোনো এমবিবিএস ডাক্তার নাই, স্টাফ নাই, মেডিসিন থাকে না। ভবনও জরাজীর্ণ। চিকিৎসা দেওয়ার কোনো পরিবেশ এখানে নেই। এসব সমস্যার সমাধানে জেলা সিভিল সার্জন সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিনি যেন পাগলা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সব সংকট দুরীকরণে তিনি যেন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহন করেন সেই কামনা করছি। একই সাথে আমাদের এমপি মহোদয় দেশে আসলে এই বিষযে কথা বলবো। তিনি স্বাস্থ্য সেবার বিষয়ে কাজ করতে খুবই আগ্রহী। আশা করছি এই সমস্যার সমাধান হবে।
হাসপাতালের সকল সংকট ও সমস্যার সমাধানে জেলা সিভিল সার্জনকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হাসান। তিনি বলেন, স্বল্প বাজেটের কারণেই মেডিসিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়না। নতুন বাজেট পেয়েছি। চেষ্টা করবো যতটুকু পারা যায় সেখানে মেডিসিন সরবরাহ করার জন্য।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, পাগলা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রচুর রোগী সেবা নিতে আসেন। যে পরিমাণ রোগী আসেন এর বিপরীতে সেখানে চিকিৎসক বা স্টাফ নেই। মেডিসিন সহ অনেক সংকট সেখানে আছে। সম্প্রতি পাগলা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। চিকিৎসক ও স্টাফ সংকট নিরসনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভবনের সৌন্দর্য্য বর্ধনের চেষ্টাও অব্যাহত আছে। আশা করছি শীঘ্রই এসব সমস্যার সমাধান হবে।